যেখানে ইতিহাস আজও প্রতিধ্বনি তোলে
সরোজ কান্তি দেওয়াঞ্জী ,
ভূমিকা
রোম শহরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অমর নিদর্শন —
কলোসিয়াম।
দুই হাজার বছরের পুরোনো এই পাথরের দানব আজও নীরবে বলে যায়
মানব সভ্যতার গৌরব, নিষ্ঠুরতা ও সময়ের গল্প।
এটি শুধু একটি প্রাচীন স্টেডিয়াম নয় —
এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা, বিনোদন ও রক্তমাখা ইতিহাসের প্রতীক।
নির্মাণের সূচনা
খ্রিস্টাব্দ ৭২ সালে রোমান সম্রাট ভেস্পেসিয়ান
রোমের জনগণের বিনোদনের জন্য এই বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটারের নির্মাণ শুরু করেন।
তার পুত্র টাইটাস ৮০ খ্রিস্টাব্দে এর উদ্বোধন করেন এক মহা উৎসবের মধ্য দিয়ে,
যেখানে টানা ১০০ দিন ধরে চলেছিল গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ ও পশু শিকার।
কলোসিয়াম নির্মিত হয়েছিল পাথর, ইট আর চুনাপাথর দিয়ে।
এর আয়তন এত বিশাল যে, তখন এখানে ৫০,০০০ দর্শক একসাথে বসে
রক্তাক্ত যুদ্ধ উপভোগ করত।
রোমের রক্তমঞ্চ
কলোসিয়ামের মঞ্চে বেঁচে থাকার জন্য লড়তো গ্ল্যাডিয়েটররা —
দাস, বন্দি বা সাহসী যোদ্ধারা, যাদের জীবনের দাম ছিল বিনোদনের একটি মুহূর্ত।
সিংহ, বাঘ, ভাল্লুকসহ নানা বন্যপ্রাণী আনা হতো
দূরদেশ থেকে, কেবল এই যুদ্ধের প্রদর্শনের জন্য।
রোমান নাগরিকরা উল্লাস করত,
কিন্তু সেই উল্লাসের নিচে লুকিয়ে ছিল শত শত জীবনের আর্তনাদ।
তবুও, সেই সময়ের কাছে কলোসিয়াম ছিল
সম্রাটের মহিমা ও রোমের অজেয় শক্তির প্রতীক।
ধ্বংস ও পুনর্জন্ম
মধ্যযুগে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও দস্যুদের লুটপাটে
কলোসিয়ামের অনেকাংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
এর পাথর ব্যবহার করা হয় চার্চ ও প্রাসাদ নির্মাণে।
তবু, যা বেঁচে আছে— তা আজও রোমান প্রকৌশলের বিস্ময়।
পরে ১৮শ শতকে পোপ বেনেডিক্ট চতুর্দশ
একেই “পবিত্র স্মৃতি” হিসেবে ঘোষণা দেন,
কারণ এখানে বহু নিরীহ প্রাণ উৎসর্গিত হয়েছিল।
তার পর থেকে কলোসিয়াম হয়ে ওঠে ইতিহাসের নীরব স্মৃতিস্তম্ভ।
আজকের কলোসিয়াম
আজ কলোসিয়াম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান,
আর বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি।
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে এখানে,
দেখতে— সেই বিশাল আকারের দেয়াল, ধ্বংসস্তূপ,
আর অনুভব করতে সেই যুগের শ্বাস।
রাতের আলোয় যখন কলোসিয়ামের গম্বুজে চাঁদের আলো পড়ে,
মনে হয়, প্রাচীন রোমান যোদ্ধাদের প্রতিধ্বনি
এখনও যেন বয়ে আসে বাতাসে।
শেষ কথা
কলোসিয়াম আমাদের শেখায় —
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিল্প ও স্থাপত্য চিরন্তন।
যে স্থান একসময় রক্তে রঙিন ছিল,
আজ সেটিই দাঁড়িয়ে আছে মানব সভ্যতার প্রতীক হয়ে।
“সময় সবকিছু মুছে দেয়,
কিন্তু কলোসিয়াম আজও দাঁড়িয়ে আছে—
রোমের অমর আত্মার মতো।”