নেদারল্যান্ডসে কিশোরগঞ্জের ১০ উপজেলার ‘নদী ও খাল সংরক্ষণ ও খনন’ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের ১০ কর্মকর্তা। তবে তাদের মধ্যে সাতজন নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তা হওয়ায় সরকারি অর্থে ইউরোপ সফর হলেও প্রকল্পের বাস্তব সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
২০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ১০ দিনের এই প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং মন্ত্রণালয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ‘২৪ জুলাই উপ-সচিব মো. জাকির হোসেনের স্বাক্ষরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিশাখা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ সফর সীমিত করেছে। এর পরও মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির তদবিরে এই সফর করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের নামে সরকারি টাকা খরচ হলেও পাউবোর কাজে এই কর্মকর্তাদের কোনো বাস্তব ভূমিকা থাকবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া তালিকায় ১০ জনের মধ্যে সাতজন নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তা হওয়ায় প্রাথমিকভাবে প্রশিক্ষণ অনুমোদন দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়, এরপরই প্রভাবশালী সুপারিশ কার্যকর হয়।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, ‘এই অভিযোগ সঠিক নয়। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস নিজেই যাচাই-বাছাই করে মূল প্রশিক্ষণের জন্য তালিকা তৈরি করেছে। প্রথমে আমিও বিভ্রান্ত হয়েছিলাম, পরে জানতে পারি যে তারা নিজস্ব উদ্যোগে এই আয়োজন করেছে। এখানে অনেক পলিসির বিষয় জড়িত। আমি কাউকে মনোনয়ন দেইনি। এখন নেদারল্যান্ডস দূতাবাসকে জিজ্ঞেস করুন তারা কেন এই আয়োজন করেছে।’
তবে প্রকল্পের পরিচালক পাউবোর ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের ১০ উপজেলায় নদীতীর সুরক্ষা ও খাল খনন কাজ সার্ভে বিষয়ে প্রকল্পের ব্যয়ে প্রশিক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। নেদারল্যান্ডসে এই প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ৭০ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের অধীনেই গত ২০ অক্টোবর থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি আমরা। এখানে নেদারল্যান্ডস সরকারের কোনো ব্যয় নেই। প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তাদের তালিকাও পাউবো ও মন্ত্রণালয় করেছে।’
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দেওয়া তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্ল্যানিং কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, তাকে (পানিসম্পদ সচিব) হয়তো মূল বিষয় অবহিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, যে কর্মকর্তা প্রকল্প তৈরি করেন তিনিই বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফরের প্রস্তাব করেন। সেখানে দেশ বিবেচনায় টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। অনুমোদনের পর এই সফরের আয়োজন করা হয়। যে দেশে ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় সেই দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সে দেশের অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের সহযোগিতা নেওয়া হয়। দূতাবাসকে অবহিত করা না হলে আবার ভিসা জটিলতাও হয়।
তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডস সরকার টাকা খরচ করবে দূরে থাক, উলটো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য নেদারল্যান্ডসে সরকারি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ডাচ প্রশিক্ষকরা সেখানে টাকা পাবেন। এখন যদি নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তা সেখানে গিয়ে থাকেন তাহলে এই টাকা খরচ পুরোটাই অপচয়। একজন সুপিরিয়র কর্মকর্তা সেখানে যেতে পারেন। তাই বলে তিন যুগ্ম সচিবসহ সিনিয়র কর্মকর্তাদের যাওয়াটা সঠিক হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রশিক্ষণার্থী হিসাবে নেদারল্যান্ডসে গেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তিনজন যুগ্ম সচিব ও একজন উপসচিব। তারা হলেন যুগ্ম সচিব (ডিজি ওয়ারপো) মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুল্লাহ আল আরিফ ও পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোল্লাহ মিজানুর রহমান। এছাড়া এই তালিকায় আছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুজিত হাওলাদার, প্ল্যানিং ডিভিশনের ডেপুটি চিফ বাবুলাল রবিদাস ও প্ল্যানিং ডিভিশনের সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট চিফ জয়া মারিয়া। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যে চার কর্মকর্তা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তারা হলেন পাউবোর ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার, পাউবো কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন, পাউবোর ঢাকা ডিভিশন সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়রা মেহজাবিন ও পাউবোর ভৈরব সাব-ডিভিশন অফিসের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মোহাম্মদ আতিকুল গনি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলায় নদীতীর সুরক্ষা কাজ, ঢেউ প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খালের পুনঃখনন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পে ৬৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সুপারিশে ২০২২ সালে প্রকল্পটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একনেকে পাশ হয়। ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারিত থাকলেও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ১৬ শতাংশ। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ২১টি স্থানে সাড়ে ১৭ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজে ব্যয় ধরা হয় ৫৭৪ কোটি টাকা। চলমান এ কাজে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি ৪ শতাংশ।
জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চার কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে গেছেন এ বিষয়ে আমি অবগত।