৩৫ বছর পর আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), হল ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ১৩টি প্যানেল; ২৩২ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৯০৮ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটারদের কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ৪০টি পদে ভোট দিতে হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ২৬টি ও হল সংসদের ১৪টি পদে ভোট দিতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি করে ভোট দিতে হবে। তবে কমিশন জানিয়েছে, ভোটাররা যথেষ্ট সময় নিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
ভোট গ্রহণ হবে ব্যালট পেপারে, আর গণনা সম্পন্ন হবে ওএমআর (অপটিক্যাল মার্ক রিডার) পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে ভোটারদের বৃত্ত পূরণ করে ভোট দিতে হবে।
চাকসুর সপ্তম এই নির্বাচনকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তাদের আশা, নির্বাচনের মাধ্যমে চাকসু পুনরুজ্জীবিত হলে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা দ্রুত সমাধানের পথ খুলে যাবে।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর ও রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসন চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।
এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৬ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪১৫ জন প্রার্থী। অন্যদিকে ১৪টি হল ও একটি হোস্টেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৯৩ জন। তাদের মধ্যে নারী মাত্র ৪৭ জন। প্রতিটি হলে রয়েছে ১৪টি করে পদ। নির্বাচনে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৫১৮ জন। এদিন বিকেল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষে ওএমআর পদ্ধতিতে গণনা শুরু হবে। হল সংসদের ফল ভোটকেন্দ্রেই ঘোষণা করা হবে। আর কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ মিলনায়তনে ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচন বিতর্কমুক্ত করতে অনুষদের ডিনদের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগের সভাপতিরা হবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। ভোটার তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে ছবি। শহরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে শাটল ট্রেনের সময়সূচি বাড়ানো হয়েছে। এদিন ১১ বার করে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করবে শাটল ট্রেন। এ ছাড়া চলাচল করবে ১৫টি বাস।
পাঁচ ভবনে ১৫ ভোটকেন্দ্র : কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট পাঁচটি অনুষদের পাঁচটি ভবনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব ভবনে ১৫টি কেন্দ্র থাকবে। প্রকৌশল অনুষদ ভবনে সোহরাওয়ার্দী হলের ৪ হাজার ৩৬ জন ভোট দেবেন। কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের নতুন ভবনে ভোট দেবেন ৫ হাজার ২৬৩ শিক্ষার্থী। বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ভোট দেবেন ৪ হাজার ৫৩৮ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ভোট দেবেন ৬ হাজার ৬০৬ শিক্ষার্থী। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবনে ভোট দেবেন মোট ৭ হাজার ৭৩ শিক্ষার্থী।
ভোটকক্ষ ৬০, বুথ ৬৮৯টি : পাঁচটি ভবনের কক্ষের আয়তন অনুযায়ী ৬০টি ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এসব ভোটকক্ষের আয়তনভেদে ৬৮৯টি বুথ রাখা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকক্ষে ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী ভোট দিতে পারবেন। কেন্দ্রের ভেতরে থাকবে ৯০টি সিসিটিভি, এলইডি স্ক্রিন থাকবে ২০টি। নির্বাচনের সময় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের গোপন কক্ষ ছাড়া সব জায়গায় ৯০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রের পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের দেখাতে ১৫টি ভোটকেন্দ্রের জন্য ২০টি এলইডি স্ক্রিন স্থাপন করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন বলেন, আমাদের ভোট হবে ব্যালটে। ভোটগ্রহণ শেষে গণনা হবে ওএমআর পদ্ধতিতে। অ্যানালগ পদ্ধতিতে গণনা করলে অনেক সময় লাগবে। তাই আমরা এ পদ্ধতিতে যাব না।
তিনি আরও বলেন, গোপন কক্ষ ছাড়া সব কেন্দ্রে থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা। ব্যালট পেপার ছাপা হবে কমিশনের উপস্থিতিতে, সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে। নির্বাচনে ব্যালট পেপারে থাকবে ২৪ অঙ্কের একটি নিরাপত্তা কোড ও একটি গোপন কোড, যা ওএমআর মেশিনে শনাক্ত করা যাবে।
এদিকে নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে ক্যাম্পাসের পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাহিনী, রোভার স্কাউট ও বিএনসিসি মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন।
র্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ-র্যাব মিলিয়ে এক হাজারের মতো ফোর্স মোতায়েন আছে। আমরা র্যাবের ৮টি টিম রেখেছি, তারা টহল দিচ্ছে। নির্বাচনের পরিবেশ সুন্দর, স্বাভাবিক আছে। আশা করি শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৮১, ১৯৯০ সালসহ এ পর্যন্ত মোট ছয় বার চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।