সরোজ কান্তি দেওয়াঞ্জী ,
রাত ছিল নিঝুম। ইয়েমেনের আকাশে তারা ঝলমল করছে, কিন্তু যেন কোনো এক অদৃশ্য প্রতীক্ষায় থমকে আছে। সেই রাতে এক নবজাতকের কান্না ভেসে এল মরুর হাওয়ায়।
বৃদ্ধ দরবেশেরা বললেন —
“এই শিশু শুধু ইয়েমেনের নয়, সে হবে এক আলোর দূত, যে আল্লাহর প্রেম নিয়ে যাবে পূর্বের দেশে।”
শিশুটির নাম রাখা হলো — শাহজালাল।
জালাল অর্থ — জ্যোতি, মহিমা। আর সত্যিই, তার মুখে ছিল এমন এক শান্ত আলো, যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে কোনো রহস্য তার চোখে লিখে দিয়েছে।
শৈশব ও সাধনার শুরু
শাহজালাল ছোটবেলায় খুব কম কথা বলতেন।
যখন অন্য বালকেরা মাঠে ছুটে বেড়াত, তিনি বালুর টিলায় বসে নাম জপতেন,
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…”
গ্রামের মানুষ বলত — “ওর চোখে যেন এক আশ্চর্য জ্যোতি।”
মাতৃস্নেহে বেড়ে ওঠা সেই শিশু অচিরেই মুখস্থ করল পবিত্র কুরআন, আর মন দিল তাসাউফে, আধ্যাত্মিক ধ্যানে।
যৌবনে পা দিতেই তাঁর সাক্ষাৎ হল পীর হযরত শেখ আহমদ কাবির (রহঃ)-এর সঙ্গে।
একদিন গুরুর দরবারে বসে আছেন, তখন পীর বললেন —
“জালাল, তোমার পথ এখানেই শেষ নয়। আল্লাহ তোমাকে পাঠিয়েছেন দূর বাংলার দিকে। সেখানে অন্ধকার আছে, তোমার আলো সেখানে পৌঁছতে হবে।”
যাত্রা শুরু
এক সকালে তিনি পীরের অনুমতি নিয়ে রওনা হলেন পূর্বের পথে।
সঙ্গে ৩৬০ জন দরবেশ — কেউ সুফি, কেউ চিকিৎসক, কেউ জ্ঞানী, কেউ কবি।
তাদের মুখে একটাই সুর — আল্লাহর নাম।পথে পাহাড় পেরোলেন, নদী পেরোলেন, যুদ্ধের ধ্বনি শুনলেন, তবু থামলেন না।
এক রাতে গঙ্গার তীরে বসে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন —“হে প্রভু, যত দূরেই যাই, তোমার আলো যেন আমার হৃদয় থেকে কখনও নিভে না যায়।”
সিলেটের আহ্বান
এদিকে বাংলার সিলেট অঞ্চলে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে।
রাজা গৌর গোবিন্দ মুসলমানদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছেন।
এক নবজাতকের কানে আজান দেওয়া হয়েছিল — রাজা রেগে সেই শিশুটিকে হত্যা করালেন।এই খবর যখন শাহজালালের কানে পৌঁছল, তিনি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর বললেন —“যেখানে অন্যায়, সেখানে নীরব থাকা অন্যায়।
আল্লাহর পথে যাওয়া মানেই মানুষের মুক্তির পথে যাওয়া।”তিনি সিলেটের পথে রওনা হলেন।
প্রেমের যুদ্ধে জয়
সুলতানের সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিলেন শাহজালাল ও তাঁর দরবেশ দল।
কিন্তু তাঁদের শক্তি ছিল না অস্ত্রে, ছিল ঈমানের আগুনে।
যুদ্ধে গৌর গোবিন্দ পরাজিত হলেন, তাঁর অহংকার মাটিতে মিশে গেল।
সেই মুহূর্তে সিলেটের আকাশে উঠল প্রথম আজান —“আল্লাহু আকবার…”
যেন সেই ধ্বনি পাহাড়, নদী, গাছের পাতায় পাতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।শাহজালাল (রহঃ) সেই ভূমিতে নামাজ পড়লেন।
যে মাটিতে আজ তাঁর দরগাহ শরিফ, সেখানেই প্রথম তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেন।মানবতার আলো
শাহজালাল (রহঃ) ছিলেন কেবল ধর্মপ্রচারক নন — তিনি ছিলেন মানবতার কবি।
তাঁর দরগায় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ — সবাই আসতেন।
একদিন এক হিন্দু কৃষক তাঁকে জিজ্ঞেস করল,“আপনার আল্লাহ কি শুধু মুসলমানের?”
তিনি হাসলেন,
“না ভাই, আল্লাহ সবার — যে ভালোবাসে, সে-ই তাঁর কাছের।”তিনি শিখিয়েছিলেন —
“মানুষকে ভালোবাসা মানেই আল্লাহকে পাওয়া।”
চিরনিদ্রা ও অমর আলো
দীর্ঘ জীবন শেষে, এক সন্ধ্যায় শাহজালাল (রহঃ) তাঁর শিষ্যদের পাশে বসে বললেন —
“আমি যাচ্ছি, কিন্তু সিলেটের বাতাসে আমার দোয়া রয়ে যাবে।
মানুষ যখন কষ্টে পড়বে, আমার দরগায় আসবে, আর শান্তি পাবে।”এরপর তিনি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলেন।
হাওয়া থেমে গেল, পাখিরা নীরব হলো।
আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছিল —
যেন শাহজালালের আত্মা এখন সেই আলো হয়ে জ্বলছে।আজও সিলেটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যদি তুমি চোখ বন্ধ করো,
হয়তো শুনতে পাবে এক নরম কণ্ঠ —“ভালোবাসাই সত্য, ভালোবাসাই ধর্ম,
আর যে ভালোবাসে — সে-ই আল্লাহর কাছে প্রিয়।”