নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শিবপুর বলদাহঘাট গ্রামে এক সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাধন চন্দ্র মজুমদার। এমন পটভূমি থাকা সত্ত্বেও তার মন্ত্রী পদে পৌঁছানো সত্যিই বিস্ময়ের বিষয়। রাজনীতির শুরু করেন হাজিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে, এরপর নওগাঁ-০১ (নিয়ামতপুর-পোরশা-সাপাহার) আসন থেকে টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
অবশ্য এর মধ্যে তিনবারই হয়েছেন বিনা ভোটের এমপি। এলাকায় কোনো জনপ্রিয়তা ছিল না তার। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন সাধন। মন্ত্রী ছাড়াও সাধন নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
এর প্রভাবেই স্থানীয় সড়ক বিভাগ, এলজিইডি এবং কৃষি বিভাগ তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরিবারের সদস্যরা তার ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নওগাঁ জেলায় গড়ে তোলেন মজুমদার সাম্রাজ্য। এ সময় অবাধে চলত অনিয়ম, দুর্নীতি ও দখল-বাণিজ্য। বিরোধী দলের সদস্যদের উপর দমন ও নির্যাতন চালিয়ে নির্বাচনি এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাধনের স্বৈরশাসন।
সাধনের রাজত্বে ছোট ভাই মনোরঞ্জন মজুমদার ও বড় মেয়ের জামাতা নওগাঁ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহম্মেদের হাতের মুঠোয় ছিল নওগাঁ। দেশের অন্যতম ধান-চালের মোকাম নওগাঁয় দামের সামান্য হেরফের হলেই ধাক্কা লাগে সারা দেশের চালের বাজারে। অথচ এ জেলাতেই বিভিন্ন গুদামে হতো অবৈধ ধান-চাল মজুত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যদের যোগসাজশে স্থানীয় বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো ধান-চাল মজুত করে রাখত। এ সিন্ডিকেটের কারণেই চালের বাজারে কখনোই কাটেনি অস্থিরতা।
তারা এভাবে শত শত কোটি টাকা লুট করেছে। সূত্রে জানা গেছে, সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর ভাই মনোরঞ্জন মজুমদারের নিয়ামতপুরে একটি চালের মিল রয়েছে, যা বড় বড় চাল ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সিন্ডিকেটের অন্য এক রকম নেশা ছিল পুকুর ও বড় জলাশয় দখল করে মাছ চাষ করা। সাধন মজুমদরের নির্বাচনি এলাকায় তিন উপজেলায় অন্তত পাঁচ থেকে ছয় হাজার জলাধার রয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে চার হাজারের অধিকই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই ‘পুকুরচুরি’ এখনও অনেকের কষ্টের কারণ। এর মধ্যে একজন হলেন নিয়ামতপুরের মাছ ব্যবসায়ী হাকিম। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বুকের পাথর নেমে গেছে। তিনি বলেন, “কত বছর নিজের জলাধারের কাছে ঘেঁষতে পারিনি! পুকুরের মাছ তুলে নিয়ে বেচে দিয়েছে মন্ত্রীর লোকজন, ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারিনি।”
অন্যদিকে রাস্তা উন্নয়ন, পাকাকরণ, সংস্কারসহ সব কাজেই ২০ শতাংশ কমিশন দিতে হতো সাধন সিন্ডিকেটকে। কমিশনের টাকা কম হলেই রোষানলে পড়তেন ঠিকাদাররা। সর্বশেষ সড়ক বিভাগের নওগাঁ সদর থেকে আত্রাই, বদলগাছি ও মহাদেবপুর এবং মান্দা থেকে নিয়ামতপুর উপজেলার ছয়টি সড়কে ১ হাজার ১২০ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়। আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নের এ প্রকল্প থেকে আগাম ২০ শতাংশ টাকা নেয় সাধন সিন্ডিকেট। এ ছাড়া নওগাঁর সব হাটবাজার নামমাত্র মূল্যে ডেকে নিতেন সাধনের পছন্দের লোকজন। এর বাইরে নওগাঁয় হাজার কোটি টাকার সিএসডি নির্মাণ প্রকল্প ও সাপাহারে অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সাধন সিন্ডিকেটের বড় ধরনের দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে অধিকাংশ জমিই বায়নাসূত্রে মালিক বনে গিয়েছিল সাধন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। কম দামে জমি কিনে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রির ছক এঁকেছিলেন তারা। তবে দেশের পটপরিবর্তনে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত নওগাঁ জেলায় ছিল অঘোষিত রাজতন্ত্র। রাজ্যজুড়ে এক নাম সাধন চন্দ্র মজুমদার। শুধু তাঁর নামে মুদ্রা প্রচলন বাকি ছিল। এ ছাড়া উদ্বোধন, দিবস পালিত, গঠিত সব অনুষ্ঠানেই তাঁর নাম রাখা চাই। না থাকলেই বরং বিপত্তি হতো সংশ্লিষ্টদের।
নওগাঁ জেলায় সরকারি নির্মাণকাজ, রাস্তাঘাট উন্নয়ন, নিয়োগ, স্কুল ম্যানেজিং কমিটি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খাসজমি ও জমি দখল, বিচার সালিশ, বাজারব্যবস্থা, বিশেষ দিবস উদযাপন, এমনকি নিজের দলের নেতৃত্ব গঠন—সবকিছুতেই অনুমোদনের দরকার পড়ত সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের। জেলা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবকিছুই তিনি করেছিলেন।
মন্ত্রী হওয়ার পর সাধন চন্দ্র সরকারি বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন, আর এসব কাজের লাভের বড় অংশই সরাসরি তার পকেটে চলে যেত।
প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রতিপক্ষদের কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। জেলার সব হাট-বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। তার ভয়ে স্থানীয় মানুষরা যেন বাঘ-মহিষের মতো এক ঘাটে পানি খেতে বাধ্য, এবং এলাকার পাতিসন্ত্রাসীরাও তার কথা মেনে চলত।
কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি নেতা-কর্মীরা কথামতো না চললে দেওয়া হতো মামলা। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রায় ২০ কোটি টাকার সরকারি খাসজমিতে মন্ত্রী প্রভাব খাটিয়ে গড়েছেন ট্রাক টার্মিনাল। নওগাঁয় হাজার কোটি টাকার সিএসডি নির্মাণের তথ্য জনগণ জানে না। সাপাহারে যে স্থানে অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হবে সেখানে অধিকাংশ জমি রয়েছে মন্ত্রী ও তাঁর লোকজনের। কম দামে জমি কিনে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রির নীলনকশা তৈরি করেছিলেন মন্ত্রী।
নওগাঁ জেলার সরকারি পুকুরগুলো প্রভাব খাটিয়ে দখলে রেখেছিলেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন মজুমদার। এসব নিয়ন্ত্রণ করত তাঁর সিন্ডিকেট বাহিনী। নওগাঁ-১ আসনের সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর-এ তিন উপজেলায় ব্যাপক মাছের চাষ হয়। লাভজনক এ চাষে আয় আসে কোটি কোটি টাকা। এতে নজর পড়ে সাধন চক্রের।
যে কারও নামেই পুকুর লিজ থাকুক না কেন, তা সিন্ডিকেটের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হতো। সরকারি এমন অনেক জলাশয় আছে, যেগুলো গত পাঁচ বছরের মধ্যে লিজ দেওয়া হয়নি। পুকুরগুলো ছিল সাধন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। দলীয় লোকজন ছাড়াও ব্যবসায়ীর কাছে কমিশনের মাধ্যমে মাছের ব্যবসাও চলত মন্ত্রীর। সাধন মজুমদারের নামে কোনো পুকুর বা বড় জলাশয় লিজ না থাকলেও তাঁর সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাতারাতি পুকুর দখল করতেন।
নওগাঁ জেলা সদরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রতিটি অফিসিয়াল কাজের জন্য অনুমোদন নিতে হতো সাধন চন্দ্র মজুমদারের। তা না মানলে তার ভাই মনোরঞ্জন মজুমদার নানা উপায়ে হেনস্থা করতেন।
যদিও পোরশা, নিয়ামতপুর ও সাপাহার ছিল সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা, তিনি নিজে শহরে বসবাস করতেন। জেলাজুড়ে তার ভাই ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা ক্ষমতার দাপট চালাতেন।
গত ১৫ বছর ধরে নওগাঁজুড়ে সাধারণ মানুষ সাধন চন্দ্র মজুমদারের শাসনে ত্রাসের পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছিলেন। এলাকাবাসীর কথায়, নওগাঁয় শাসন করতেন সাধনের স্বৈরশাসন।