বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যস্ততা ও আলোচনার মাত্রা বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে একটি গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নির্বাচনের অংশ হিসেবে আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হবে এবং ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।
উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা—আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম—আগামী সপ্তাহে পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন।
এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যা নিয়ে সমালোচনা করছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁদের মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনিক রদবদলের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সরকারের আগে থেকেই প্রশাসন পুনর্গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করছে।
ড. আলী রিয়াজকে ঘিরে বিতর্ক
সংস্কার কাঠামো প্রণয়নে ড. আলী রিয়াজের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় তাঁকে উপদেষ্টার সমমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় ড. ইউনূসের সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে।
এছাড়া ড. আলী রিয়াজের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন এক নারী কবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর অভিযোগ ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগের পর ওই নারী পুলিশি হয়রানির আশঙ্কা প্রকাশ করে নিজের নিরাপত্তা দাবি করেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ড. আলী রিয়াজ ওই তরুণীকে চেনেন না। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপদেষ্টা পরিষদে রদবদল হতে পারে বলেও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দুই ছাত্র উপদেষ্টার পাশাপাশি আরও কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন বলে আলোচনা চলছে।
জোট রাজনীতির হিসাব
অন্যদিকে নির্বাচনি জোট গঠন নিয়েও তৎপরতা বাড়ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে বুধবার রাতে নাহিদ ইসলামের বাসায় এক বৈঠক করে। বৈঠকে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)-কে জোটে নেওয়ার প্রস্তাব উঠলে আলোচনা থমকে যায়।
বৈঠকে উপস্থিত ৪০ নেতার মধ্যে মাত্র তিনজন আপ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে মত দেন। কেউ কেউ বিএনপির সঙ্গে জোট করার পক্ষে, আবার কেউ এককভাবে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে এনসিপি নেতারা পুরোপুরি অনাগ্রহী। ফলে জোট প্রশ্নে এনসিপির ভেতরে ভাঙনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আসিফ মাহমুদের নির্বাচন ভাবনা
পদত্যাগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং পদত্যাগ করেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাঁর ভাষায়, উপদেষ্টা হয়ে নির্বাচন করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ নয়, তবে নীতিগত কারণে তা সমীচীন নয়। কোন দল থেকে নির্বাচন করবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, শুধু ছাত্র উপদেষ্টারাই নন, আরও কয়েকজন উপদেষ্টাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। আসিফ মাহমুদ আগে কুমিল্লার ভোটার হলেও সম্প্রতি ঢাকা-১০ আসনের ভোটার হয়েছেন। এ কারণে ওই আসন থেকেই তাঁর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। উল্লেখ্য, বিএনপি এখনো ঢাকা-১০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেনি।
মাহফুজ আলমকে ঘিরে আলোচনা
অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বিভিন্ন সময়ে দেওয়া মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কারণে আলোচনায় রয়েছেন। দায়িত্বশীলদের একটি অংশের মতে, উপদেষ্টা পরিষদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।
নতুন রাজনৈতিক দল
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেপথ্যে ভূমিকা রাখা একদল ব্যক্তির উদ্যোগে চলতি বছরের ৯ মে নতুন রাজনৈতিক দল ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)’ আত্মপ্রকাশ করে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কয়েকজন শীর্ষ নেতার সম্পৃক্ততায় গঠিত এ দলের ৮২ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ এবং সদস্য সচিব আরেফিন মুহাম্মদ হিজবুল্লাহ।