নিউইয়র্ক সিটিতে নির্বাচনী ঝড়ের পর নতুন মেয়র জোহরান মামদানি গ্রেসি ম্যানশনে উঠছেন। ৩৪ বছর বয়সী মামদানিকে ইতিমধ্যেই প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাট সমর্থকরা উদযাপন করছেন, আর রিপাবলিকান পার্টি ও ধনশালীরা অজানা আশঙ্কায় রয়েছেন।
মামদানির নির্বাচনী বিজয় ভাষণে স্পষ্ট বার্তা ছিল শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। তিনি ধনীদের ওপর ২ শতাংশ অতিরিক্ত আয়কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা ‘মিলিয়নিয়ার ট্যাক্স’ নামে পরিচিত। এই রাজস্ব ব্যবহার হবে সাশ্রয়ী ভাড়া, বিনামূল্যে গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে। তিনি বলেন, “যখন ধনীরা আরও ধনী হয় আর শ্রমজীবী শ্রেণি পিছিয়ে পড়ে, তখন শহর টিকে না; শুধু বিলাসবহুল আকাশচুম্বী ভবন দাঁড়িয়ে থাকে।”
সমালোচকেরা বলছেন, অতিরিক্ত কর আরোপ করলে ধনীরা শহর ছাড়তে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নিউইয়র্কের জীবনযাত্রা ও ব্যবসায়িক সুযোগ এ ধরনের স্থানান্তর সহজ করবে না। ২০১৯ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, কর বৃদ্ধি সত্ত্বেও ধনীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
মামদানিকে ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন, ন্যায্য রাজস্ব কাঠামো শুধু অর্থনৈতিক ভারসাম্যই আনবে না, বরং রাজনৈতিক আস্থা ও নাগরিক অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে। তার উপদেষ্টা বলেন, “এটা কেবল করের প্রশ্ন নয়; এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।” নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল ও অ্যালবানি রাজ্য আইনসভায় তার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শিগগিরই শুরু হবে।
বিজয়ী নির্বাচনের রাতেই মামদানি বলেছিলেন, ধনীদের জন্য নয়, সমাজের জন্য শহর তৈরি করতে চান। তার লক্ষ্য সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবহন ও শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বিনামূল্যে গণপরিবহন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর-সহায়তা পরিকল্পনা করেছেন। তার যুক্তি: “শহরের অর্থনীতি টিকবে তখনই, যখন সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসাগুলো টিকে থাকবে।”
মামদানি নিউইয়র্কের ব্যবসায়িক সমাজের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান। তিনি আশাবাদী, প্রশাসন ও বেসরকারি খাত একসাথে কাজ করলে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও জনকল্যাণ একসাথে গাঁথা সম্ভব।
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর, বলিউডের গান ‘ধুম মচালে’-এর সঙ্গে বিজয় উদযাপন করেন। তার ভাষণে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণ, যেখানে তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। পরিবারের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
রিপাবলিকানরা মামদানিকে আটকানোর চেষ্টা চালালেও ব্যর্থ হয়েছে। তারা তার নাগরিকত্ব বাতিল ও কমিউনিস্ট সম্পর্কিত অভিযোগ তুলেছে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাননি। মামদানি ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ২০১৮ সালে নাগরিকত্ব পান।
নির্বাচনের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রজন্ম, নারী ও বৈচিত্র্যময় নেতৃত্বের উত্থান দেখিয়েছে। নিউইয়র্কে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন। মামদানির প্রচারণা রাস্তায়, পার্কে, দোকানে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন আকর্ষণীয় ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে।
প্রচার দলের মতে, জীবনের ব্যয় ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর মনোযোগ তাদের সাফল্যের বড় কারণ। প্রচারণার স্টাইল সেই মূল বার্তার পর এসেছে।
মামদানি এখন গ্রেসি ম্যানশনের বাসিন্দা হবেন, যেখানে উচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিলাসবহুল ব্যবস্থা ও ঐতিহ্য রয়েছে। এখানে থাকার ফলে তার নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের সুবিধা নিশ্চিত হবে।
সংক্ষেপে, জোহরান মামদানির বিজয় শুধুই রাজনৈতিক নয়; এটি একটি নতুন প্রজন্মের, বৈচিত্র্যময় ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ নেতৃত্বের উদ্ভবের প্রতীক।