পুলিশের টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশই মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) ছিলেন—হাইকোর্টের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমনটাই উঠে এসেছে। রায়ে বলা হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে প্রদীপ সিনহার বুক ও গলায় জুতা পরা পা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে, সাবেক পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে সরকারি পিস্তল দিয়ে সিনহার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরপর চারটি গুলি করেন, যা তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
এর আগে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রদীপ ও লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং আরও ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সেই রায় বহাল রেখে চলতি বছরের ২ জুন হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। আজ রবিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি বাংলা ভাষায় লেখেন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, যার সঙ্গে একমত হন বিচারপতি মো. সগীর হোসেন।
প্রদীপের ভূমিকা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়—সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে প্রদীপ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও ঘটনাস্থলে থেকে সিনহাকে নির্যাতন ও শারীরিক আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
লিয়াকতের পূর্বপরিকল্পিত গুলি
রায়ে বলা হয়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী লিয়াকত ঘটনাস্থলে গিয়ে নিরস্ত্র সিনহার ওপর পরপর চারটি গুলি চালান। ময়নাতদন্তে এই গুলির আঘাতেই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
কেন মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হলো
হাইকোর্ট বলেছে, হত্যাকাণ্ডে প্রদীপ মূল পরিকল্পনাকারী এবং নিজ হাতে নির্যাতন করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন, আর লিয়াকত হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছেন। তাই বিচারিক আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
ষড়যন্ত্র ও নজরদারি
রায়ে উঠে আসে, ‘জাস্ট গো’ ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভিডিও ধারণ করতে কক্সবাজারে গিয়ে সিনহা ও তাঁর সহকর্মীরা স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রদীপের চাঁদাবাজি, গুম ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ জানতেন এবং সেই তথ্যের সাক্ষ্যও ধারণ করেছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে প্রদীপ সিনহাকে এলাকা থেকে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সিনহা তা অমান্য করলে প্রদীপ লিয়াকতসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং সিনহার গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে সোর্স নিযুক্ত করেন।
ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে স্থানীয় মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ‘ডাকাত এসেছে’ বলে ঘোষণা দিয়ে জনরোষ সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছিল—সেই প্রমাণও রায়ে উঠে এসেছে।
যেসব আসামির যাবজ্জীবন বহাল
যারা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল পেয়েছেন তারা হলেন—সাবেক এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেব এবং বাহারছড়ার নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও নিজাম উদ্দিন। আদালত বলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সাধারণ অভিপ্রায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাঁদের সাজাও যথার্থ।
মামলার প্রেক্ষাপট
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পরিদর্শক লিয়াকতের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা। মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ২০২২ সালে হাইকোর্টে আসে। আসামিদের জেল আপিল ও আপিল নামঞ্জুর করে এবং বাদীর রিভিশন খারিজ করে হাইকোর্ট গত ২ জুন রায় ঘোষণা করেন। আজ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও যুক্তি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।