যুক্তরাষ্ট্রে এক সেন্টের কয়েন ‘পেনি’ উৎপাদন বন্ধের ফলে দেশজুড়ে খুচরা পয়সার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে গ্যাস স্টেশন, ফাস্ট ফুড চেইন, সুপারস্টোরসহ সব ধরনের খুচরা ব্যবসায় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নগদ লেনদেন বাধ্য হয়ে অনেক দোকান এখন দাম ‘রাউন্ড ফিগার’ করে নিচ্ছেন, যা ক্রেতাদের অসন্তোষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে চলতি বছর পেনি উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সরকার বা কংগ্রেস নগদ লেনদেনে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের সুবিধার জন্য দাম ‘রাউন্ড ডাউন’ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অর্থাৎ কম দামে বিক্রি করছেন। যেমন কোনো পণ্যের দাম ১২.৯৯ টাকা হলে তা ১২ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, যা বড় অঙ্কের ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের (এনআরএফ) সরকারি সম্পর্ক বিভাগের পরিচালক ডিলান জিওন বলেন, ‘যেকোনো ব্যবসা যারা নগদ গ্রহণ করে, তারা এখন বড় সমস্যার মুখোমুখি। রাউন্ড ডাউন করার কারণে অনেক পণ্য কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ সংগঠনটি জানিয়েছে, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে পেনির ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং কোথাও এর কোনো সামঞ্জস্য নেই।
পেনসিলভানিয়ার শিটজ নামের একটি ফ্যামিলি-চেইন কনভেনিয়েন্স স্টোর ইতিমধ্যেই তাদের দোকানে নোটিশ টাঙিয়েছে, ‘দেশে আর পেনি তৈরি হচ্ছে না, তাই খুচরা কম!’ সেখানে গ্রাহকদের কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। যারা চাইলে অতিরিক্ত পেনি জমা দিয়ে বিনা মূল্যে পানীয়ও নিতে পারছেন।
উইসকনসিনভিত্তিক কুইক ট্রিপ জানিয়েছে, তাদের ৮৫০টি দোকানে নগদ লেনদেনে দাম এখন থেকে নিচের দিকের পাঁচ সেন্টে রাউন্ড করা হবে। টেক্সাসের ডালাসের এক দোকানে ঝোলানো নোটিশে বলা হয়েছে, ‘আমরা পেনির ঘাটতির মুখে, তাই খুচরা না-ও পেতে পারেন।’
বৃহৎ সুপারস্টোর ক্রোগার জানিয়েছে, তারা এখনো প্রভাব মূল্যায়ন করছে। এরই মধ্যে বহু শাখায় ক্রেতাদের ‘এক্সাক্ট চেঞ্জ’ বা সঠিক দাম দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। ভার্জিনিয়ার এক সিভিএস ফার্মেসিতেও এমন নোটিশ ঝোলানো আছে।
এদিকে দেশে বিষয়টি নিয়ে শোরগোল পড়ে গেলেও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড আগেই তাদের সবচেয়ে কম মূল্যের কয়েন তুলে দিয়েছে। ওই সব দেশে এখন নগদ লেনদেন নিকটবর্তী পাঁচ সেন্টে রাউন্ড করা হয়, তবে ইলেকট্রনিক পেমেন্টে সঠিক মূল্যই থাকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রেও এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে খরচ বাঁচবে এবং খুচরা অর্থ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক, ইলিনয় প্রভৃতি অঙ্গরাজ্যে আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের নগদ লেনদেনে সঠিক খুচরা দিতে হয়, যা এখন নতুন জটিলতা তৈরি করছে।
ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন (এনআরএফ) ও অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠন ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের কাছে এ বিষয়ে অভিন্ন নির্দেশিকা চেয়েছে—লেনদেনে রাউন্ডিংয়ের নিয়ম কী হবে, তা নির্দিষ্ট করতে। এনআরএফ কর্মকর্তা জিওন বলেন, ‘সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্পষ্টতা—দোকানিরা কি ওপরের দিকে রাউন্ড করতে পারবেন, নাকি নিচে? অল্প হলেও তারা কি কম দামে পণ্য বিক্রি করবেন?’
এক যৌথ চিঠিতে গ্যাস স্টেশন, গ্রোসারি, ভ্রমণকেন্দ্রসহ একাধিক সংগঠন কংগ্রেসকে সতর্ক করেছে, ‘যদি দ্রুত নির্দেশনা না দেওয়া হয়, তবে দেশের বহু এলাকায় বৈধ নগদ লেনদেনই অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
৬৪০টির বেশি শাখা পরিচালনাকারী লাভস ট্রাভেল স্টপস জানিয়েছে, তাদের দোকানেও সংকট শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘যখন কোনো দোকানে পেনি ফুরিয়ে যায়, তখন লেনদেনের বাকি টাকাটা ক্রেতার পক্ষে সামঞ্জস্য করা হয়, অর্থাৎ কোম্পানি পার্থক্যটা মেটায়।’
ট্রাম্পের নির্দেশের পর গত মে মাসে ট্রেজারি বিভাগ শেষ ব্যাচ পেনি তৈরির অর্ডার দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোকে পেনি সরবরাহ বন্ধ করেছে।
ট্রেজারি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি পেনি তৈরি করতে সরকারের খরচ ৩.৬৯ সেন্ট; অর্থাৎ কয়েনটির মুখ্য মূল্যের চেয়ে তিন গুণ বেশি। ফলে পেনি তৈরি বন্ধে বছরে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
এদিকে পেনি সংকট নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, পেনি বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখে। এ ছাড়া এটি দাতব্য সংস্থার তহবিলের প্রধান উৎস। আবার অনেকে মনে করেন, এটি অপ্রয়োজনীয় বোঝা, যা বেশির ভাগ সময় ড্রয়ার, গাড়ির ছাইদানি বা মাটির ব্যাংকে পড়ে থাকে।
পেনসিলভানিয়ার বাসিন্দা স্যান্ডি বার্গার বলেন, ‘আমি বলতে পারব না, শেষ কবে পেনি নিয়ে বাইরে গিয়েছি। সত্যি বলতে, এগুলো হারালে কেউ বিশেষ কিছু মনে করবে না।’