নিউইয়র্ক সিটির আসন্ন নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটার চাইলে এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন— এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগামী ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ইতিহাস বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভোটের ময়দানে রয়েছেন বাংলাদেশি ভোটাররা।
মূলধারার রাজনীতিকরা বলছেন, “বাংলাদেশি ভোটস ম্যাটার”— শুধু প্রচারণায় নয়, এবার ইতিহাস গড়ার সুযোগ ভোটকেন্দ্রে। মেয়র, পাবলিক অ্যাডভোকেট, কম্পট্রোলারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন বাংলাদেশি ভোটারদের গুরুত্ব অনুধাবন করছেন। তাই মেয়র পদে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী— ডেমোক্রেট প্রার্থী জোহরান মামদানি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু ক্যুমো— দুজনই ভোট প্রার্থনায় ছুটে যাচ্ছেন বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে।
অতীতে স্টেট ও ফেডারেল নির্বাচনে বাংলাদেশিদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। তবে গত ২৪ জুন অনুষ্ঠিত নিউইয়র্ক সিটি প্রাইমারিতে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বাংলাদেশি ভোট বেড়েছে ওই প্রাইমারিতে। ফলে প্রার্থীরা এখন বাংলাদেশি ভোটারদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাডভোকেসি গ্রুপ (বাগ)-এর প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদীন বলেন, “বাংলাদেশিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। অনেক পরিবারেই সবাই নাগরিক হলেও রেজিস্ট্রার্ড ভোটার খুব কম। আমরা সেই সংখ্যা বাড়াতে কাজ করছি।” তিনি জানান, বাগের উদ্যোগে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। “এখন আমাদের লক্ষ্য ভোটকেন্দ্রে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বাড়ানো। আশা করি, ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে,” যোগ করেন তিনি।
নিউইয়র্কে মূলধারার অভিজ্ঞ রাজনীতিক, অ্যালায়েন্স অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লেবারের (অ্যাসাল) প্রেসিডেন্ট, ডিস্ট্র্টি-৩৭ এর ট্রেজারার এবং লোকাল-১৪০৭ এর প্রেসিডেন্ট মাফ মিসবাহ উদ্দিন ঠিকানাকে বলেন, জুনে অনুষ্ঠিত প্রাইমারিতে ভোটকেন্দ্রে আশানুরূপ উপস্থিতি মুলধারায় বাংলাদেশিদের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি বিপুলসংখ্যক নারী ফোন ব্যাংকিংয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, নিউইয়র্ক সিটিতে ৬২-৬৫ হাজার বাংলাদেশি আমেরিকান ভোটার রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রাইমারিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে এই অংশগ্রহণ আরো বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের ভোটকেন্দ্রে আসার পরামর্শ দিয়ে মাফ মিসবাহ বলেন, ‘শুধু মাঠে সরব নয়, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ইতিহাস গড়ুন। আমরা সেই ইতিহাসের দোরগোড়ায় রয়েছি।’
২০২৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী- নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান জনসংখ্যা ৮০ লাখ ৯৭ হাজার। এর মধ্যে শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা সিটির মোট জনসংখ্যার ৩৭.৪৭ শতাংশ; কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান আমেরিকান জনসংখ্যা ২৩.১ শতাংশ; অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৫.৩৮ শতাংশ; এশিয়ান ১৪.৪৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ৯.৫৭ শতাংশ। সিটি অধিবাসীদের মধ্যে ৬৩.৬৬ শতাংশের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। ন্যাচারালাইজড সিটিজেন, যারা ভোটার, তাদের সবচেয়ে বড় অংশ ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলো থেকে আগত। নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশির মধ্যে ন্যাচারালাইজড আমেরিকান সিটিজেন সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও কোনো নির্বাচনী প্রচারণা অভিযানে বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশি আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।
একাধিক সূত্রমতে- আমেরিকান নির্বাচনগুলোর নেতিবাচক দিক হচ্ছে, ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভোট প্রদানে অনীহা। শুধু তাই নয়, জন্মসূত্রে হোক বা ন্যাচারালাইজড সিটিজেন হোক, তাদের একটি বড় অংশ ভোটার হতেও আগ্রহ পোষণ করেন না। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটিতে বর্তমানে সক্রিয় ভোটার সংখ্যা ৪৭ লাখ। মোট ভোটারের মধ্যে ৩১ লাখ রেজিস্ট্রার্ড ডেমোক্রেট ভোটার। নিউইয়র্ক প্রচলিতভাবেই একটি ডেমোক্রেট স্টেট এবং নিউইয়র্ক সিটিও একইভাবে ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত। সে জন্য নিউইয়র্ক সিটিতে রেজিস্ট্রার্ড রিপাবলিকান ভোটার সংখ্যা মাত্র ৫ লাখ ২৩ হাজার। কোনো দলের রেজিস্ট্রার্ড ভোটার নয় এমন ভোটার সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ। অর্থাৎ সিটির ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশ ডেমোক্রেট ভোটার, প্রায় ১১ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার এবং প্রায় ২১ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার।
প্রাইমারি নির্বাচনে কোনো ভোটারকে তিনি যে দলের রেজিস্ট্রার্ড ভোটার, সেই দলের প্রার্থীকেই তাকে ভোট প্রদান করতে হবে। কোনো রেজিস্ট্রার্ড ডেমোক্রেট ভোটার প্রাইমারিতে কোনো রিপাবিলিকান প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন না। তাহলে তার ভোট কোনো প্রার্থীর পক্ষে গণনা করা হবে না। তবে যেদিন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, অর্থাৎ এবার মেয়র নির্বাচনের দিন আগামী ৪ নভেম্বর তারিখে যে কোনো দলের রেজিস্ট্রার্ড ভোটার অন্য দলের প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারবেন।
নিউইয়র্ক বোর্ড অব ইলেকশনসের চিত্র অনুযায়ী, সিটিতে নিকট অতীতে অনুষ্ঠিত যে কোনো নির্বাচন, তা সাধারণ নির্বাচন বা ভোট প্রদানের দিবসে হোক, অথবা আগাম ভোট ও ডাকযোগে প্রেরিত ভোট হোক, যে কোনো নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের চূড়ান্ত গণনা অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কমসংখ্যক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সে হিসাবে যারা মেয়র, পাবলিক অ্যাডভোকেট, কম্পট্রোলার, বরো প্রেসিডেন্ট অথবা সিটি কাউন্সিল সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন, তারা মূলত সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে সাউথ এশিয়ান এবং তরুণদের ভোট সবদিক থেকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষি হতে চলেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
উল্লেখ্য, ২৫ অক্টোবর শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে আগাম ভোট, যা চলবে ২ নভেম্বর রোববার পর্যন্ত। সাধারণ নির্বাচন ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার। এদিন ভোটগ্রহণ করা হবে সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। যারা এদিন ভোট দিতে পারবেন না, তাদের আগাম ভোট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে নিউইয়র্ক সিটি বোর্ড অব ইলেকশন।
৪ নভেম্বর মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শেষে মধ্যরাতেই জানা যাবে কে হবেন নিউইয়র্ক সিটির পরবর্তী মেয়র।