সরোজ কান্তি দেওয়াঞ্জী ,
গঙ্গা–যমুনার দুই নদীর মাঝে, আগ্রার নীরব আকাশের নিচে
এক সময়ে বসবাস করতেন এক বেদনাবিধুর সম্রাট —
শাহজাহান।
তার রাজত্ব ছিল শক্তি, সাম্রাজ্য, রথ, হাতি, সেনা—
কিন্তু তার হৃদয়ের রাজ্য ছিল একটাই — মুমতাজ মহল।
তিনি ছিলেন সম্রাটের স্ত্রী,
কিন্তু তার কাছে তিনি ছিলেন সঙ্গী, সঙ্গীত, শান্তি।
প্রেমের সেই শেষ দিন
একদিন…
যুদ্ধ অভিযানে থাকাকালীন,
মুমতাজ মহল সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে
মৃত্যুর কোঠায় পৌঁছে গেলেন।
তার শেষ নিশ্বাসে তিনি শাহজাহানের হাত চেপে ধরে বলেছিলেন —
“আমার প্রেম যেন চলে না যায়… আমায় ভুলে যেও না…”
এরপরই সব নীরব হয়ে যায়।
সম্রাট কেঁদেছিলেন,
এক শক্তিশালী সম্রাট —
বিশ্বজয়ের অধিপতি —
নিজ রাজপ্রাসাদের বারান্দায় বসে,
অবিরাম কেঁদেছিলেন।
শুরু এক স্মৃতিস্তম্ভের
সেই কান্না থেকেই জন্ম হয় এক সিদ্ধান্তের—
“আমি তার স্মৃতিকে এমনভাবে গড়ে তুলব,
যাতে আকাশও তার সৌন্দর্যে নত হয়ে যায়।”
২২ বছর ধরে
দিন-রাত জ্বলেছে প্রদীপ,
খোদাই হয়েছে মার্বেল,
রঙিন পাথর এসেছে আরব, পারস্য, ভেনিস, তুর্কি দেশের বাজার থেকে।
কারিগররা বলতেন —
এ যেন প্রাসাদ নয়, একটি কবিতা খোদাই হচ্ছে পাথরে।
তাজমহল দাঁড়িয়ে যায়
ফজরের নরম আলো যখন সাদা মার্বেলে পড়ে —
মনে হয় যেন মুমতাজ নিজেই আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
রাতের আঁধারে চাঁদ উঠলেই
তাজমহল রূপ নেয় রূপালী স্বপ্নে —
যেন মৃত্যুর পরও প্রেম বেঁচে আছে।
এ প্রাসাদের দেয়াল জানে,
প্রতিটি খোদাই জানে—
শাহজাহানের অশ্রু কোন কোন রাতে কেমন ঝরেছে।
সময়ের পরিণতি
বৃদ্ধ বয়সে শাহজাহান নিজেই বন্দী হন আগ্রা কেল্লায়।
প্রতিদিন দূর থেকে তাকিয়ে দেখতেন
তাজমহলের দিকে —
যেখানে শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছেন তার মুমতাজ।
যেদিন তিনি মারা গেলেন,
তার দেহও নিয়ে যাওয়া হয়
মুমতাজের কবরের পাশে।
দুটি হৃদয় —
যারা জীবনে এক হয়েছিল,
মৃত্যুতেও — পাশাপাশি।
শেষ লাইন
তাজমহল শুধু মার্বেল নয় —
একজন মানুষের কান্নার সাদা ভাস্কর্য।
এটি পৃথিবীর মুঠো ভরা প্রমাণ যে —
সত্যিকারের প্রেম – মৃত্যুর পরও মরে না।