Dark
Light
Today: November 18, 2025
October 14, 2025
18 mins read

ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব নির্মাণে ছয় দফা উদ্যোগ প্রস্তাব করলেন প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৈশ্বিক খাদ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গঠনে ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ক্ষুধা কোনো সম্পদের অভাবে নয়, বরং এটি আমাদের তৈরি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। এই ব্যবস্থাই পরিবর্তন করতে হবে।’

রোববার ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সদর দপ্তরে আয়োজিত বিশ্ব খাদ্য ফোরাম (ডব্লিউএফএফ) ২০২৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রথম প্রস্তাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, যুদ্ধ থামাতে হবে, সংলাপ শুরু করতে হবে এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে—এভাবেই ক্ষুধা ও সংঘাতের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে তিনি উল্লেখ করেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বাস্তবায়ন করতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দিতে হবে।

তৃতীয় প্রস্তাবে তিনি বলেন, আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠন করে খাদ্য সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল রাখতে হবে।

চতুর্থ প্রস্তাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে।

পঞ্চম প্রস্তাবে তিনি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাণিজ্যনীতিকে খাদ্য নিরাপত্তার সহায়ক হতে হবে, বাঁধা নয়।

ষষ্ঠ প্রস্তাবে তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের তরুণ কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘২০২৪ সালে ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, অথচ আমরা যথেষ্ট খাদ্য উৎপাদন করেছি। এটি উৎপাদনের ব্যর্থতা নয়— এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা, নৈতিক ব্যর্থতা।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষুধা দূর করতে যেখানে কয়েক বিলিয়ন ডলার জোগাড় করা যায়নি, সেখানে অস্ত্র কিনতে বিশ্ব ব্যয় করেছে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। একে কি আমরা অগ্রগতি বলব?’

অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পুরোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা পদ্ধতি কোটি কোটি মানুষকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন এক নতুন ব্যবসা পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে— সামাজিক ব্যবসা, যা ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের সমস্যা সমাধানের জন্য।’

অধ্যাপক ইউনূস তার স্বপ্নের ‘তিন-শূন্য বিশ্ব’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ) ধারণা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি কোনো কল্পনা নয়, এটি অপরিহার্য— বিশ্ব বাঁচানোর একমাত্র পথ।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার সাফল্য আমরা দেখেছি। গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে, দরিদ্র নারীরাও উদ্যোক্তা হতে পারেন। গ্রামীণ দানোন শিশু অপুষ্টির বিরুদ্ধে কাজ করছে। বিশ্বজুড়ে এমন বহু সামাজিক ব্যবসা মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘তরুণ, নারী, কৃষক, কৃষিুউদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের সহায়তায় সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে হবে। এই ধরনের উদ্যোগের জন্য আইনগত ও আর্থিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, বাঁধা নয়।’

তরুণদের ভূমিকা তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের চাকরি খোঁজার কথা বলবেন না, বরং চাকরি সৃষ্টির ক্ষমতায়ন করুন।’

তিনি বলেন, ‘তরুণদের বিনিয়োগ তহবিল ও সামাজিক ব্যবসা তহবিলের মাধ্যমে মূলধনে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। কৃষি-উদ্ভাবন কেন্দ্র, কৃষিুপ্রযুক্তি, চক্রাকার খাদ্য ব্যবস্থা ও জলবায়ু স্মার্ট উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা দিতে হবে।’

তিনি যোগ করেন, ‘যুব সমাজের ওপর বিনিয়োগ করলে শুধু বিশ্বকে খাদ্য দিতে পারব না, বিশ্বকেই বদলে দিতে পারব।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জোটের (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার অ্যান্ড পোভার্টি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আমরা এফএও ও জি-২০-এর সঙ্গে মিলিতভাবে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তিনি আহ্বান জানান, ‘আসুন, একটি তিন-শূন্য বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করি।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এই ফোরামের তিনটি স্তম্ভ—যুব, বিজ্ঞান ও বিনিয়োগ—শুধু স্লোগান নয়, এটি আমাদের খাদ্যব্যবস্থা ও সমাজ রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে সম্পদ ও প্রযুক্তি রয়েছে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি আসবে। এখন দরকার সৃজনশীল চিন্তা ও সঠিক ব্যবসা কাঠামো—যার মাধ্যমে আমরা নতুন বিশ্ব গড়ে তুলতে পারব। আমরা যদি কল্পনা করতে পারি, আমরা তা বাস্তবেও সৃষ্টি করতে পারব।’

বক্তৃতার শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এফএও’র ৮০ বছর পূর্তি শুধু উদযাপন নয়, এটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতির আহ্বান।’

তিনি বলেন, ‘এ বছরের প্রতিপাদ্য— ‘হাত ধরে হাতে, উন্নত খাদ্য ও উন্নত ভবিষ্যতের পথে’—আমাদের মনে করিয়ে দেয়: খাদ্য শুধু ক্যালরির ব্যাপার নয়, এটি মর্যাদার, ন্যায়ের এবং আমরা কেমন পৃথিবীতে বাস করতে চাই তার প্রতিচ্ছবি।’

তিনি এফএওুর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী খাদ্য নিরাপত্তা ও শান্তি জোটের প্রশংসা করে বলেন, এটি ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।

প্রধান উপদেষ্টা ২০২৪ সালের বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তরুণরা সাহস ও আশায় ভরপুর হয়ে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই করেছে। তাদের দাবি ছিল ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি ও আস্থার ভিত্তিতে সমাজ গঠন।’

তিনি যোগ করেন, ‘এ তরুণরাই এখন নতুন বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে—যেখানে জনগণ শাসনের কেন্দ্রে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হবে, যার মাধ্যমে আমরা ন্যায় ও জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেব।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করছে এবং মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকেও আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে আছি ধান, সবজি ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে। কৃষকরা ফসলের নিবিড়তা ২১৪ শতাংশে উন্নীত করেছেন এবং আমরা জলবায়ু সহনশীল ১৩৩ প্রজাতির ধান উদ্ভাবন করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ করেছি, ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছি, শক্তিশালী খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, অপুষ্টি কমিয়েছি, খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য এনেছি এবং কৃষিকে সবুজ করেছি— মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে অবশেষে গাজা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত

Next Story

মধ্যরাতে হঠাৎ কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন দূতাবাসে

Previous Story

বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে অবশেষে গাজা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত

Next Story

মধ্যরাতে হঠাৎ কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন দূতাবাসে

Latest from Blog

ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে আজ শুনানি

শেখ হাসিনার রায়কে ঘিরে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের শুনানি আজ। রোববার (৩০ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে গত বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফজলুর

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই, মশাল রোড শো স্থগিত: রিজভী

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে বিজয়ের মাস উপলক্ষে ঘোষিত ‘মশাল রোড শো’

সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য

সচিবালয়ের নবনির্মিত কেবিনেট ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। রোববার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের নবনির্মিত

সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষতি ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সময়মতো সঠিক প্রস্তুতি নিলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এড়িয়ে

আইজিপি ইন্টারপোলের সম্মেলন শেষ করে দেশে ফিরেছেন।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত ইন্টারপোলের ৯৩তম সাধারণ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পর দেশে ফিরেছেন। তিনি গতকাল শনিবার দেশে ফেরেন। এই তথ্য আজ শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো
Go toTop

Don't Miss

ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে আজ শুনানি

শেখ হাসিনার রায়কে ঘিরে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই, মশাল রোড শো স্থগিত: রিজভী

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার