নাটকের শেষ দৃশ্য যেন এখনও মঞ্চস্থ হয়নি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একের পর এক নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়। আন্দোলন-জয়ের পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে—তার ভিত্তি স্থাপন করে জুলাই সনদ। সেই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে। এ ঘটনার পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে দিল্লিতে যান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান।
এদিকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের ‘এক্সিট প্ল্যান’ এখনো পরিষ্কার নয়। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি; দোলাচলে আছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও। শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় দলটির পরবর্তী নেতৃত্ব কে দেবেন—এ প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে। উত্তরসূরি বাছাইয়ে দলটির দীর্ঘদিনের উদাসীনতাও নতুন করে সামনে এসেছে।
আইসিটি শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। সে সময়কার আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুন দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই রায় হলেও তা অনুপস্থিতিতে বিচার হিসেবে হয়েছে, কারণ দুজনই বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এক মাসের মধ্যে হাজির হয়ে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হলেও হাজির না হলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও রয়েছে রায়ে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে মৃত্যুদণ্ড অগ্রহণযোগ্য—এই যুক্তিতে তারা রায়টি সমালোচনা করছে। অন্যদিকে ধারণা করা হচ্ছে, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় ভারত ছাড়াও আরও কিছু দেশ শেখ হাসিনা ও কামালকে আশ্রয় দিতে আগ্রহী হতে পারে।
শেখ হাসিনা রায়কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি একটি “ক্যাঙ্গারু কোর্ট”—ন্যায়বিচারহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধ বিচারেই যেখানে আইসিটি গঠিত হয়েছিল, সেই আইন সংশোধন করে এখন তার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। প্রসিকিউশনে জামায়াতপন্থী আইনজীবীর অন্তর্ভুক্তি এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। রায় ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগ লকডাউন-শাটডাউন ডেকে চাপের মুখে পড়ে এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েই কর্মীরা শঙ্কায় আক্রান্ত হন।
আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না—এ নিয়েও জনমতে দ্বিধা রয়েছে। খলিলুর রহমান দিল্লি যাওয়ার আগেই প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেবে না। তবে ভারত বরাবরই অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চেয়েছে। খলিল দুর্ভাগ্যবশত আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, শেখ হাসিনার অবস্থান ও নির্বাচন—দুই বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নতুন নয়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ভারত সফর থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের সুজাতা সিংয়ের আলোচিত ঢাকা সফর—বহু উদাহরণ আছে। এবার যদিও ভারতের দিক থেকে প্রকাশ্য কোনো প্রস্তাব জানা যায়নি, তবু পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির বক্তব্যে স্পষ্ট—ভারত অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করে, যেখানে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে।
আওয়ামী লীগ, এর মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি এবং ১৪-দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কিনা তা এখনো অস্পষ্ট। তবে এ দলগুলোর মিলিত ভোট অন্তত ৩০ শতাংশ। তাদের বাইরে রাখলে বিপুলসংখ্যক ভোটার নিজের পছন্দের প্রার্থী পাবেন না—এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।