ঢাকার ইতিহাসের রাজকীয় নিদর্শন
সরোজ কান্তি দেওয়াঞ্জী ,
ভূমিকা
বুড়িগঙ্গার শান্ত জলের তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাপি স্বপ্ন—
যে প্রাসাদ একসময় ঢাকার রাজকীয়তার প্রতীক ছিল।
তার নাম আহসান মঞ্জিল।
আজ এটি ইতিহাস, স্থাপত্য আর গৌরবের এক জীবন্ত দলিল।
প্রাসাদের জন্ম
১৮৫৯ সালে ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গণি সিদ্ধান্ত নিলেন
তিনি এমন এক রাজপ্রাসাদ গড়বেন,
যা তাঁর পরিবারের ঐশ্বর্য আর মর্যাদাকে যুগ যুগ ধরে ধরে রাখবে।
ফরাসি বণিকদের পুরোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষের ওপর
শুরু হলো সেই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ।
তার প্রিয় পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ-র নামে নাম রাখা হয়
“আহসান মঞ্জিল”— যার অর্থই হলো “অত্যন্ত সুন্দর প্রাসাদ”।
গৌরবের দিনগুলো
আহসান মঞ্জিল ছিল নবাব পরিবারের হৃদয়।
এখানেই হতো সভা-সমাবেশ, অতিথি আপ্যায়ন, সঙ্গীত ও নৃত্য আসর।
ইংরেজ গভর্নর, রাজনীতিক, জমিদার— সবাই আসতেন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে।
ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করত হলঘর,
মার্বেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠত রাজপথের মর্যাদা।
এই প্রাসাদেই একসময় বাংলা মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা হয়।
১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্মের পেছনে
এই মঞ্জিলের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
ধ্বংস ও পুনর্জন্ম
১৮৮৮ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে
প্রাসাদটির একাংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
গম্বুজ ভেঙে পড়ে, ছাদ ছিঁড়ে যায়, দেয়াল ফেটে যায়।
ঢাকা তখন কেঁদেছিল যেন নিজের হৃদয়ের এক অংশ হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু নবাব আহসানুল্লাহ হাল ছাড়েননি।
তিনি বলেছিলেন,
“আহসান মঞ্জিল আবার উঠবে— আগের চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে।”
আর সত্যিই তাই হলো।
পুনর্নির্মাণের পর প্রাসাদটি হয়ে উঠল আরও দৃষ্টিনন্দন,
আরও রাজকীয়।
অবক্ষয় থেকে জাদুঘরে
সময়ের সঙ্গে নবাব পরিবারের প্রভাব ম্লান হয়ে গেল।
আহসান মঞ্জিল পড়ে রইল অবহেলায়, ধুলায়, নীরবতায়।
তবে ইতিহাস কখনো চুপ থাকে না।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার
প্রাসাদটি সংরক্ষণ ও সংস্কার করে
জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেয়।
আজ এটি শুধু একটি ভবন নয়—
ঢাকার আত্মা, অতীতের গৌরবের প্রতীক।
শেষ কথা
যে কেউ আহসান মঞ্জিলের সিঁড়িতে দাঁড়ালে
মনে হবে, সময় যেন একটু থেমে গেছে।
বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ে ভেসে আসে পুরোনো সেতারের সুর,
নবাবদের হাসি, আর এক রাজকীয় যুগের প্রতিধ্বনি।
আহসান মঞ্জিল আজও বলে যায়—
“আমি ঢাকার ইতিহাস, আমি তার হৃদয়ের গোলাপি প্রাসাদ।”