যেখানে ইসলামি স্থাপত্য মিশেছে ইউরোপীয় রোমান্টিকতায়
সরোজ কান্তি দেওয়াঞ্জী ,
ভূমিকা
স্পেনের দক্ষিণ প্রান্তে, গ্রানাডা শহরের পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রাসাদ—
তার নাম আলহামব্রা।
লালচে পাথরের দেয়ালে সূর্যের আলো পড়লে মনে হয়,
প্রাসাদটি যেন আগুনে গড়া এক স্বপ্ন!
এ শুধু একটি প্রাসাদ নয়,
এটি ইসলামি স্থাপত্য, শিল্প ও রাজকীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত নিদর্শন,
যেখানে সময় এখনো ধীরে ধীরে বয়ে চলে আরব সুরে।
আলহামব্রার জন্ম
১৩শ শতাব্দীতে আন্দালুসিয়ার মুসলিম শাসক নাসরিদ রাজবংশের সুলতান মুহাম্মদ প্রথম
গ্রানাডার পাহাড়চূড়ায় এই প্রাসাদের নির্মাণ শুরু করেন।
পরে তাঁর উত্তরসূরিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
এর পরিধি, সৌন্দর্য ও শৌর্য আরও বাড়িয়ে তোলেন।
“আলহামব্রা” নামটির অর্থ আরবি থেকে এসেছে —
“আল-কাসরুল হামরা”, অর্থাৎ “লাল প্রাসাদ”।
পাহাড়ের মাটির রঙের মতোই প্রাসাদের দেয়ালও লালচে,
যা সূর্যাস্তের সময় রক্তিম আলোয় জ্বলে ওঠে।
রাজকীয় ঐশ্বর্য
আলহামব্রার প্রতিটি কক্ষে আছে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম,
আরবি ক্যালিগ্রাফি, মার্বেল খোদাই, মোজাইক নকশা ও প্রবাহমান জলের ধারা।
এর কেন্দ্রে “কোর্ট অব দ্য লায়ন্স”,
যেখানে বারোটি সিংহমূর্তি ঘিরে আছে একটি ফোয়ারা—
যা প্রতীক বহন করে শক্তি, সৌন্দর্য আর জীবনের প্রবাহের।
প্রাসাদের বারান্দা থেকে দেখা যায় তুষারঢাকা সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালা,
আর নিচে সবুজ বাগান “জেনারালাইফ”,
যেখানে ফুল, ফোয়ারা ও পাখির ডাক মিলে এক স্বপ্নিল আবহ তৈরি করে।
অবসান ও পরিবর্তন
১৪৯২ সালে মুসলিম শাসনের পতনের পর
আলহামব্রা চলে যায় খ্রিষ্টান রাজাদের অধীনে।
তারা এর কিছু অংশ ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলে,
তবুও প্রাসাদের মূল ইসলামি রূপ আজও অমলিন।
পরে নেপোলিয়নের সৈন্যরা একে ধ্বংস করতে চেয়েছিল,
কিন্তু স্থানীয় এক সৈনিকের সাহসিকতায়
এই ইতিহাস বেঁচে যায় ধ্বংসের হাত থেকে।
আধুনিক আলহামব্রা
আজ আলহামব্রা শুধুই ইতিহাস নয়,
এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
প্রতিদিন বিশ্বের হাজার হাজার মানুষ আসে এখানে
ইসলামি শিল্প, স্থাপত্য ও প্রেমের এক নিঃশব্দ ভাষা দেখতে।
রাতের আকাশে যখন প্রাসাদের গম্বুজে চাঁদের আলো পড়ে,
তখন মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে—
আর বয়ে যাচ্ছে কেবল ইতিহাসের নিঃশব্দ সুর।
শেষ কথা
আলহামব্রা হলো সেই স্থান
যেখানে সভ্যতার সংঘর্ষ নয়, বরং মিলনের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
ইউরোপের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই লাল প্রাসাদ
আজও বলে যায়—
“সৌন্দর্যই হলো ক্ষমতা, আর শিল্পই ইতিহাসের চিরন্তন ভাষা।”